মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি

এশিয়ার চালের বাজারে স্থবিরতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার জেরে আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজের ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ার প্রধান চাল রফতানিকারক দেশগুলোয় বাণিজ্যিক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো বড় রফতানিকারক দেশগুলোয় চালের দাম কমলেও বা স্থিতিশীল থাকলেও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বর্তমানে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছেন। বিশ্ববাজারের এ পরিস্থিতির মধ্যেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম চড়া রয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত মজুদ এবং ভালো ফলন হওয়া সত্ত্বেও চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খবর বিজনেস রেকর্ডার।

বিশ্বের শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ ভারতে এ সপ্তাহে চালের দাম কিছুটা কমেছে। রুপির বিনিময় হার রেকর্ড পরিমাণে কমে যাওয়ায় ৫ শতাংশ ভাঙা সেদ্ধ চালের দাম প্রতি টন ৩৪৩-৩৫০ ডলারে নেমে এসেছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ৩৪৮-৩৫৩ ডলার। একইভাবে ভারতের ৫ শতাংশ ভাঙা সাদা চালের দামও টনপ্রতি ৩৪২-৩৪৮ ডলারে নেমেছে। তবে দাম কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় চালের চাহিদা বর্তমানে বেশ কম। নয়াদিল্লিভিত্তিক রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজের ফ্রেইট রেট বা ভাড়া ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে বিদেশী ক্রেতারা নতুন করে কার্যাদেশ না দিয়ে তাদের হাতে থাকা মজুদ দিয়েই কাজ চালাচ্ছেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

ভিয়েতনামের বাজারেও একই চিত্র ফুটে উঠেছে। দেশটিতে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম টনপ্রতি ৩৫০-৩৫৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ৩৫৫-৩৬০ ডলার ছিল। হো চি মিন সিটির ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দেশটিতে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে বছরের শুরু থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ভিয়েতনাম মোট ১৭ দশমিক ৪ লাখ টন চাল রফতানি করেছে।

এদিকে থাইল্যান্ডে চালের বাজার প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। সেখানে ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম প্রতি টন ৩৬৫-৩৭০ ডলারে কেনাবেচা হচ্ছে। ব্যাংককভিত্তিক ব্যবসায়ীরা বলছেন, আফ্রিকা থেকে কিছু চাহিদা থাকলেও তা খুব একটা শক্তিশালী নয়। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ ক্রেতা এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, আগামীতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এবং উৎপাদন গত বছরের তুলনায় কম হলে চালের দাম আরো বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে যখন রফতানি কার্যক্রমে এ স্থবিরতা, তখন বাংলাদেশের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। দেশে বাম্পার ফলন ও সরকারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও চালের দাম কমছে না। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সুগন্ধি চালের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর দাম আরো চড়া হয়েছে। সাধারণ মোটা ও মাঝারি চালের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণেই দাম এভাবে বাড়ছে।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে বাংলাদেশ সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার একদিকে যেমন ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান জোরদার করেছে, অন্যদিকে বেসরকারি আমদানিকারকদেরও চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। উৎসব মৌসুমে চাল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসাই এখন সরকারের লক্ষ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, জাহাজ ভাড়া তত বেশি অস্থিতিশীল থাকবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে এশিয়ার চালের বাজারে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সচল রাখার পাশাপাশি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চালের এ বিশ্ববাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও